প্রসেনজিৎ বিশ্বাস, নগরকান্দা প্রতিনিধি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিকে টানা ছয় থেকে সাত মাস ধরে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে সরকারের তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রামীণ প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের মানুষ। সাধারণত জ্বর, সর্দি-কাশি, অ্যালার্জি, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো সাধারণ রোগের চিকিৎসাসেবা নিতে এসে রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ পেলেও প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরছেন।
সরেজমিনে উপজেলার কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিক ঘুরে দেখা যায়, স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করলেও ক্লিনিকগুলোর জরুরি ওষুধের মজুদ পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। চিকিৎসাসেবা ও পরামর্শ কার্যক্রম চালু থাকলেও স্টোরে ওষুধ না থাকায় গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষ সরকারের এই ফ্রি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ক্লিনিকে সেবা নিতে আসা পুরাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রাজীব হোসেন জানান, তিনি তার অসুস্থ সন্তানের জ্বর ও সর্দি-কাশির ওষুধ নিতে ক্লিনিকে এসেছিলেন। চিকিৎসক তাকে দেখলেও কোনো ওষুধ দিতে পারেননি। একই গ্রামের রহিমা খাতুন ও রাবেয়া আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বেশ কয়েক দিন ধরে ক্লিনিকে এসেও কোনো ওষুধ মেলেনি। বাধ্য হয়ে তাদের মতো দরিদ্র মানুষকে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।
উপজেলার ২২টি কমিউনিটি ক্লিনিকে একজন করে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার, একজন স্বাস্থ্য সহকারী ও একজন পরিবার পরিকল্পনা সহকারী দায়িত্ব পালন করছেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত ওষুধের সরবরাহ না থাকায় রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মীদের। প্রায়ই তাদের রোগীদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে।
কোদালিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার চাঁদনী চৌধুরী জানান, আগে যেখানে বছরে ১২ কার্টন ওষুধ পাওয়া যেত, সেখানে গত বছর মিলেছে মাত্র ৯ কার্টন। বর্তমানে দাদ ও অ্যালার্জির মলম এবং জ্বর, কাশি ও ঠান্ডার ওষুধের সংকট সবচেয়ে বেশি। নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় তারা রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ দিতে পারছেন না। অন্যদিকে পুরাপাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা মোসাম্মৎ রাবেয়া আক্তার জানান, গত জানুয়ারিতে তারা সর্বশেষ ওষুধের চালান পেয়েছিলেন, যার পর আর কোনো ওষুধ আসেনি। ওষুধের এই তীব্র সংকটের কারণে ক্লিনিকে এখন রোগীর সংখ্যাও দিন দিন কমে যাচ্ছে।
ক্লিনিকগুলোতে প্রসূতি সেবা, টিকাদান ও সাধারণ পরামর্শ কার্যক্রম চালু থাকলেও ওষুধের অভাবে সেবার মূল কার্যকারিতা হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে দরিদ্র রোগীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ওষুধ সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইফতেখার আজাদ বলেন, সাধারণত চাহিদা অনুযায়ী চার মাসের ওষুধ একসঙ্গে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু ওষুধ আসার পর স্থানীয় রোগীরা দ্রুত তা সংগ্রহ করে নেন, যার ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই মজুদ শেষ হয়ে যায়। তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন যে, আগামী দুই-এক দিনের মধ্যেই নতুন ওষুধের সরবরাহ পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কমিউনিটি ক্লিনিক গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম প্রধান ভরসা। এই সেবার মূল উদ্দেশ্য ধরে রাখতে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।