বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের সূচি চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই ডালাস যেন ফুটবল উন্মাদনার কেন্দ্রবিন্দু। বেলজিয়ামকে বিদায় করে শেষ চারে জায়গা নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গেই শহরটিতে যাত্রার চাহিদা হু হু করে বেড়ে যায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিমানের ভাড়া প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পায়। তবুও ইউরোপের দুই ফুটবল পরাশক্তির লড়াই দেখতে হাজারো সমর্থকের আগ্রহে ভাটা পড়েনি।
এই ম্যাচকে ঘিরে উত্তেজনার বড় কারণ, এটি কেবল একটি সেমিফাইনাল নয়; বরং সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় ফুটবলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। একদিকে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে কেন্দ্র করে দুরন্ত গতির ফ্রান্স, অন্যদিকে লামিনে ইয়ামাল, পেদ্রি ও নিকো উইলিয়ামসদের নান্দনিক পাসিং ফুটবলে সমৃদ্ধ স্পেন।
বেলজিয়ামকে হারানোর পর আত্মবিশ্বাসে ভরপুর স্পেন শিবির। তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল প্রকাশ্যেই বলেছেন, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিবেচনায় ফ্রান্সেরই স্পেনকে সবচেয়ে বেশি সমীহ করা উচিত। পরিসংখ্যানও স্প্যানিশদের পক্ষেই কথা বলছে। গত কয়েক বছরে বড় মঞ্চে দুই দলের একাধিক লড়াইয়ে জয় পেয়েছে লা রোজা।
তবে প্রতিপক্ষকে হালকাভাবে নিতে নারাজ স্পেনের প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তাঁর মতে, ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচটি হবে শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং কৌশলগত পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বাস করেন, বর্তমান ছন্দ ধরে রাখতে পারলে ফাইনালে ওঠার সামর্থ্য তাদের রয়েছে।
স্পেনের আত্মবিশ্বাসের পেছনে রয়েছে দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা। টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থেকে তারা স্পর্শ করেছে আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের রেকর্ড। আর মাত্র একটি ম্যাচ এড়িয়ে যেতে পারলেই ইতালির টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থাকার বিশ্বরেকর্ডে ভাগ বসাবে স্প্যানিশরা। এই যাত্রায় গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে নকআউট—প্রতিটি ধাপেই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে তারা।
অন্যদিকে ফ্রান্সও টুর্নামেন্টজুড়ে ছিল দুর্দান্ত। গ্রুপ পর্বে প্রতিপক্ষদের ওপর একের পর এক দাপুটে জয় তুলে নেওয়ার পর নকআউটেও একই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে দিদিয়ের দেশমের দল। আক্রমণভাগে কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে ও সতীর্থদের গতি ও কার্যকারিতা প্রতিটি প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গোল করেছে ফ্রান্স। দলটির আক্রমণের বড় ভরসা অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে, যিনি ব্যক্তিগতভাবেও গোলদাতাদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন। বিপরীতে স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের রক্ষণভাগ। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করা স্প্যানিশ ডিফেন্স এবার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক মুখোমুখি লড়াইয়ে স্পেন এগিয়ে থাকলেও ফ্রান্সের কাছে এই ম্যাচের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। আগের দুটি বড় আসরের সেমিফাইনালে স্প্যানিশদের কাছে হারার স্মৃতি এখনও তাড়া করে ফিরছে দেশমের দলকে। তাই এই ম্যাচ তাদের কাছে শুধু ফাইনালের টিকিট নয়, প্রতিশোধ নেওয়ারও সুযোগ।
সব মিলিয়ে ডালাসে অপেক্ষা করছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় লড়াইগুলোর একটি। একদিকে ইতিহাস গড়ার স্বপ্নে বিভোর স্পেন, অন্যদিকে অতীতের হতাশা ভুলে নতুন অধ্যায় লিখতে প্রস্তুত ফ্রান্স। ইউরোপের দুই ফুটবল শক্তির এই মহারণে কে হাসবে শেষ হাসি, সেটিই এখন কোটি ফুটবলপ্রেমীর সবচেয়ে বড় অপেক্ষা।