নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শেষ বাঁশি বাজতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে স্পেন। অন্যদিকে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন লিওনেল মেসি। কিছুক্ষণ পর টেলিভিশন ক্যামেরা যখন তার মুখের দিকে ঘুরে যায়, তখন দেখা যায় চোখ বেয়ে নেমে আসছে অশ্রুধারা। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যায় আর্জেন্টিনার। সেই সঙ্গে শেষ হয়ে যেতে পারে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির মহাকাব্যিক অধ্যায়ও।
এখনও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি ৩৯ বছর বয়সী এই সুপারস্টার। তবে ফুটবলবিশ্বের বড় একটি অংশ মনে করছে, এটিই হয়তো আলবিসেলেস্তেদের হয়ে তার শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ক্যারিয়ার পরিসংখ্যানই বলে দেয় তার মহত্ত্বের গল্প। ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল, একটি বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা ও একটি ফিনালিসিমা—দেশের হয়ে জেতার মতো প্রায় সবকিছুই জয় করেছেন তিনি। তবুও দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপার খুব কাছে গিয়েও থেমে যেতে হলো স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে।
বয়স যেন কেবল একটি সংখ্যা—২০২৬ বিশ্বকাপে সেটিই আবারও প্রমাণ করেছেন মেসি। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি করেছেন ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, টানা আট ম্যাচে গোল করার নজির এবং বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১২ অ্যাসিস্টের নতুন রেকর্ড গড়ে আরও একবার নিজের অসাধারণ সামর্থ্যের পরিচয় দিয়েছেন তিনি।
তবে ফাইনালে স্পেনের পরিকল্পিত রক্ষণভাগের সামনে খুব একটা ছন্দ খুঁজে পাননি আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। প্রথমার্ধে মাত্র ১৫ বার বল স্পর্শ করেন তিনি। পুরো ম্যাচজুড়ে তাকে নিবিড়ভাবে মার্কিং করে রাখেন স্প্যানিশ ডিফেন্ডাররা। ফলে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগও কার্যকর হয়ে উঠতে পারেনি।
অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে স্পেন এগিয়ে যায়। শেষ মুহূর্তে সমতা ফেরানোর চেষ্টা করেও সফল হয়নি আর্জেন্টিনা। শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গেই মেসির দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও ভেঙে যায়।
ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি মেসির ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, "সে যতদিন ইচ্ছা খেলতে পারে। এই বিশ্বকাপে সে যা করেছে, তা অবিশ্বাস্য। আমার কাছে এবং বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে সে সর্বকালের সেরা ফুটবলার।"
শুধু মেসিই নন, শিরোপা হারিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রদ্রিগো দি পল, নিকোলাস ওতামেন্দিসহ আর্জেন্টিনার একাধিক ফুটবলার। স্কালোনিও স্বীকার করেন, ড্রেসিংরুমে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি তিনি।
অন্যদিকে স্পেনের জয়সূচক গোলদাতা ফেরান তোরেস বলেন, "মেসির মতো একজনকে সামনে পেলে চাপ থাকেই। কিন্তু আমরা নিজেদের পরিকল্পনায় বিশ্বাস রেখেছিলাম এবং সেটাই সফল হয়েছে।"
২০০৬ সালে বিশ্বকাপ অভিষেকের পর থেকে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ছিল সংগ্রাম, সমালোচনা ও ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনন্য গল্প। ২০১৪ বিশ্বকাপ ও টানা তিনটি বড় ফাইনাল হারার হতাশা, ২০১৬ সালে অবসরের ঘোষণা, এরপর ফিরে এসে কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা এবং বিশ্বকাপ জয়—সব মিলিয়ে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম অনুপ্রেরণার নাম লিওনেল মেসি।
পরবর্তী বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে ২০৩০ সালে। তখন মেসির বয়স হবে ৪৩ বছর। তাই অনেকের ধারণা, ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালই হয়তো আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। যদিও আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও নেননি আটবারের ব্যালন ডি'অরজয়ী এই কিংবদন্তি।
ট্রফি জিততে না পারলেও ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে আবারও প্রমাণ করেছেন—লিওনেল মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি একটি যুগের নাম।