হরিধানের উদ্ভাবক কৃষক-বিজ্ঞানী হরিপদ কাপালী: মাঠের মাটিতে নতুন ধানের ইতিহাস
বাংলাদেশের কৃষির ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের অবদান কোনো গবেষণাগারের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের গবেষণার ক্ষেত্র ছিল সবুজ ধানখেত, আর পরীক্ষাগার ছিল প্রকৃতির বুক। তেমনই এক অনন্য নাম কৃষক-বিজ্ঞানী হরিপদ কাপালী। তাঁর উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত হরিধান আজও কৃষি উদ্ভাবনের এক অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায়।দীর্ঘদিন আগে নিজের ধানক্ষেতে কাজ করার সময় হরিপদ কাপালী একটি ব্যতিক্রমী ধানের গোছা লক্ষ্য করেন। অন্যগুলোর তুলনায় এতে শীষ ছিল বড়, ধানের সংখ্যাও বেশি এবং গাছটি ছিল অধিক শক্তিশালী। একজন প্রকৃত গবেষকের মতো তিনি বিষয়টি উপেক্ষা না করে সেই গাছটি আলাদা করে সংরক্ষণ করেন।পরবর্তী মৌসুমে সেই গাছের বীজ থেকে ছোট পরিসরে চাষ শুরু করেন। কয়েক বছর ধরে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার পর তিনি নিশ্চিত হন, নতুন এই ধানের ফলন প্রচলিত বিআর-১১ ও স্বর্ণা জাতের তুলনায় বেশি। শুধু ফলনই নয়, তুলনামূলকভাবে কম সারেও ভালো উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছিল।হরিপদ কাপালীর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর উদারতা। নতুন জাতের ধানের বীজ তিনি কখনো ব্যবসার পণ্য বানাননি। বরং আশপাশের কৃষকদের হাতে বিনা দ্বিধায় বীজ তুলে দিয়ে বলতেন—"ভালো ফলন পেলে অন্য কৃষকদেরও দিও।" এভাবেই মুখে মুখে ও কৃষকের হাত ধরে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে "হরিধান"।পরে বিষয়টি বিজ্ঞানীদের নজরে আসে। গবেষক ও কৃষিবিজ্ঞানীদের উদ্যোগে ধানটির জিনগত বিশ্লেষণ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে পরিচালিত পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়, হরিধান কোনো প্রচলিত জাতের অনুলিপি নয়; এটি প্রাকৃতিক পরিবর্তন ও সংকরায়ণের মাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র ধানের জাত। গবেষণার ফল আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতেও প্রকাশিত হয়।হরিধানের গল্প আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—বিজ্ঞান কেবল আধুনিক গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার মধ্যেও জন্ম নিতে পারে যুগান্তকারী আবিষ্কার। দেশের হাজার বছরের কৃষি ঐতিহ্যে অসংখ্য নতুন ফসলের জাত এভাবেই কৃষকের হাত ধরে এসেছে।২০০৬ সালে কৃষিতে অসামান্য অবদানের জন্য হরিপদ কাপালী চ্যানেল আই কৃষি পদক লাভ করেন। এরপরও তিনি ছিলেন সহজ-সরল, মাটির মানুষ। ২০১৭ সালের ৬ জুলাই ৯৪ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর কর্ম ও উদ্ভাবন আজও বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা এবং কৃষকদের অনুপ্রেরণা জোগায়।বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা ও খরার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। সেই বাস্তবতায় হরিপদ কাপালীর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের কোনো কৃষকের পর্যবেক্ষণও ভবিষ্যতের বড় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সূচনা হতে পারে।কৃষক-বিজ্ঞানী হরিপদ কাপালী শুধু একটি ধানের জাতের উদ্ভাবক নন; তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে কৌতূহল, অধ্যবসায় এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর নজর একজন সাধারণ মানুষকেও অসাধারণ অবদানের জায়গায় পৌঁছে দিতে পারে। বাংলাদেশের কৃষি ও বিজ্ঞানচর্চায় তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।