মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ২২ আষাঢ় ১৪৩৩
Faridpur Today

অশ্রুসিক্ত বিদায় নেইমারের, ব্রাজিল অধ্যায়ের ইতি টানলেন কিংবদন্তি

একদিন যে স্বপ্ন নিয়ে ব্রাজিল জাতীয় দলে পা রেখেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না। বহু বছরের অপেক্ষা, অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত আর অসংখ্য লড়াইয়ের পর অবশেষে সেলেসাওদের জার্সিকে বিদায় জানালেন নেইমার। নরওয়ের বিপক্ষে ২-১ গোলের পরাজয়ে বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের বিদায়ের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান দেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার।শেষ বাঁশি বাজতেই হতাশায় মাঠে বসে পড়েন নেইমার। চোখে-মুখে ফুটে ওঠে অপূর্ণ স্বপ্নের যন্ত্রণা। কিছুক্ষণ সতীর্থদের সঙ্গে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকার পর তিনি দর্শকদের দিকে হাত নেড়ে বিদায় জানান। গ্যালারিতে উপস্থিত ব্রাজিল সমর্থকদের অনেকেই তখন অশ্রুসিক্ত চোখে প্রিয় তারকাকে শেষবারের মতো সম্মান জানান।ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি নেইমার। তিনি বলেন, "আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। প্রতিটি ম্যাচে দেশের জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি। এই যাত্রা শুরু হয়েছিল মেটলাইফ স্টেডিয়ামে, আর এখানেই শেষ হলো। এখন আমার ব্রাজিল অধ্যায়ের সমাপ্তি।"এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হলো ব্রাজিলের জার্সিতে প্রায় দেড় দশকের এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়। জাতীয় দলের হয়ে ৮০ গোল করে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে নিজের নাম স্থায়ীভাবে লিখে রেখেছেন তিনি। দীর্ঘদিন কিংবদন্তি পেলের রেকর্ড স্পর্শ করার পর শেষ পর্যন্ত সেটি ছাড়িয়ে যান নেইমার। ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের দিক থেকে ইতিহাসের শীর্ষে উঠলেও বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁতে না পারার আক্ষেপ তাকে সারাজীবন তাড়া করে ফিরবে।মাত্র কিশোর বয়সেই ব্রাজিলের জার্সিতে অভিষেক হয়েছিল নেইমারের। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন দেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় মুখ। তার অসাধারণ ড্রিবলিং, গতি, সৃজনশীলতা এবং গোল করার ক্ষমতা কোটি কোটি সমর্থককে মুগ্ধ করেছে বছরের পর বছর। বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্লাবগুলোর হয়ে সাফল্য পেলেও জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।তবে জাতীয় দলের হয়ে তার অর্জনের ঝুলিও কম সমৃদ্ধ নয়। ২০১৩ সালে কনফেডারেশন্স কাপ জয়ে দলের প্রধান নায়ক ছিলেন তিনি। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে জিতেছিলেন সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। সেই সময় অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, ভবিষ্যতের বিশ্বকাপও হয়তো নেইমারের হাত ধরেই ফিরবে ব্রাজিলে।কোপা আমেরিকায়ও সাফল্যের খুব কাছে গিয়েছিলেন তিনি। ২০২১ সালের ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে পরাজয়ের কারণে শিরোপা অধরাই থেকে যায়। অন্যদিকে ২০১৪ বিশ্বকাপে ইনজুরির কারণে সেমিফাইনালে খেলতে না পারার আক্ষেপ আজও ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের কষ্ট দেয়। সেই আসরে তার অনুপস্থিতিতেই ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল ব্রাজিল।পরবর্তী বিশ্বকাপগুলোতেও দলের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন নেইমার। কিন্তু চোট, ভাগ্যের নির্মমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের ব্যর্থতা মিলিয়ে স্বপ্নের ট্রফি আর ছোঁয়া হয়নি। এবারের বিশ্বকাপে শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিতে হওয়ায় সেই আক্ষেপ আরও গভীর হয়ে উঠেছে।নেইমারের বিদায়ের মধ্য দিয়ে শুধু একজন ফুটবলারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারই শেষ হলো না, শেষ হলো ব্রাজিল ফুটবলের একটি স্মরণীয় যুগও। প্রায় দেড় দশক ধরে সেলেসাওদের আক্রমণের মূল ভরসা ছিলেন তিনি। তার জার্সি, তার উদযাপন, তার চোখধাঁধানো গোল আর মাঠের জাদুকরী মুহূর্তগুলো দীর্ঘদিন ধরে ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে।বিশ্বকাপের ট্রফি হয়তো তার হাতে ওঠেনি, কিন্তু ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে নেইমারের নাম লেখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে। পরিসংখ্যান, প্রতিভা এবং অবদানের বিচারে তিনি ইতোমধ্যেই নিজেকে কিংবদন্তিদের কাতারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আর তাই বিদায়ের এই মুহূর্তে সমর্থকদের কণ্ঠে একটাই কথা—ধন্যবাদ, নেইমার।

অশ্রুসিক্ত বিদায় নেইমারের, ব্রাজিল অধ্যায়ের ইতি টানলেন কিংবদন্তি